নঃ হন্যতে – যে অনুভূতির বিনাশ নেই

নঃ হন্যতে – যে অনুভূতির বিনাশ নেই

মানব জীবনের সোনালী সময় কৈশোর। কৈশোরে যে প্রেম আসে তা চিরকাল না থাকলেও মনে ঠিকই দাগ কেটে রাখে। কখনো কখনো হয়ত পরতে হয় বিব্রতকর অবস্থায়। আবার কখনো হয়তোবা, মনে প্রেমটা না রয়ে গেলেও সুখের স্মৃতি হিসাবে তা মনে ঠিকই রয়ে যায়। 

অমৃতার আজ স্বামী, পুত্র, পুত্র বধু, নাতি-নাতনীদের নিয়ে সংসার। অনেকদিন বাদে পরিচিত এক ভদ্রলোক বাড়িতে আসেন। অমৃতাকে নিয়ে এক ফিকশনাল গল্প বলে নাড়িয়ে দিয়ে যায় তার স্মৃতির বাক্স। একে একে সব যেন ছবির মত ভেসে উঠতে থাকে তার মনে। এরপর দিনের পর দিন সে বাস করে দুই ভুবনে। এক তার বৃদ্ধ সত্ত্বার ভুবন, আরেক তার ষোড়শী সত্ত্বার। 

মির্চা। এই একটা নাম মাথায়। যাকে সে শেষ দেখেছিল ষোলো বছর বয়সে অশ্রুসজল নয়নে।

ভারত স্বাধীন হয়ার আগের কথা। অমৃতার বাবা নাম করা পণ্ডিত। অনেকেই আসে তার শিষ্য হতে। তেমনি, সাত সাগরের ওপার থেকে একদিন আসে ২১/২২ বছরের এক যুবক। এদেশে শিক্ষকের বাড়িতে থেকেই সে শিক্ষা গ্রহণ করবে। প্রথম দিনেই গুরু পরিচয় করিয়ে দেয় তাঁর ১৫বছর বয়সী মেয়ের সাথে। তারা দুজন একসাথে বাবার কাছে পড়ে, পাঠ্য বিষয় আলোচনা করে, আড্ডা দেয়, ঘরের কাজ করে, বাবার সাথে শান্তিনিকেতন এ যায়, রবীঠাকুরের সাথে সময় কাটায়। এক সময় তারা উপলব্ধি করে তাদের হৃদয়টাও একে অপরের হয়ে গেছে। প্রথম প্রেমের উপলব্ধি এত মধুর হয় বুঝি? ঈশ্বর যেন সব সুখ ঢেলে দিয়েছেন এদুটি হৃদয়ে। তারা সহপাঠী, বন্ধু, আবার অন্যকিছু, সেটা যে কী?! এক মধ্যদুপুরে কাজের ফাঁকে মির্চা কাছে টেনে নেয় অমৃতাকে। পাঠাগারের দরজার সামনে দাঁড়িয়েও তারা কিছুক্ষণ এর জন্য হাড়িয়ে যায় অন্য ভুবনে। দিন যায়, দুটি প্রাণ কাছে আসতেই থাকে। তবে বেশিদিন আড়ালে থাকা গেল না। জোরপুর্বক আলাদা হতে হয় তাদের। অমৃতা তো প্রায় পাগল হয়ে পরে এ বিচ্ছেদে, বিরহে। 

আজ এতদিন পর আবার সব মনে পড়ছে। মির্চা কেন এতদিন পর এমন একটা কাজ করল? কেন তাকে ছোট করল, এমন অপবাদ দিয়ে? জানতে হবে। হ্যাঁ। দেখা করবে অমৃতা। প্রশ্ন করবে। অবশেষে সেইদিন আসে। মির্চা আজ তার সামনে।

এছাড়াও, পুরো বই জুড়ে আছে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ এর অপূর্ব চিত্র, রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন অমৃতার রবীঠাকুরকে ঘিরে স্মৃতিকথা। এই বইটাতে আমি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ কে আলাদা করে চিনলাম।

ন হন্যতে এক অপুর্ব, কিন্তু হৃদয়ে দাগকাটা উপন্যাস।  প্রথমবার পড়ার পর তার প্রভাবে অনেক রাত স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন দেখে কেটেছে। প্রথম পড়েছিলাম অমৃতার মত বয়সে, সে সময়ে অনুভব করা হৃদয়ের চিনচিনে ব্যথাটা আজও রয়ে গেছে। হয়তো এর বিনাশ নেই…। ন হন্যতে।

LEAVE A COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *